E-mail: deshhitaishee@gmail.com  | 

Contact: +91 33 2264 8383

৬১ বর্ষ ১৬ সংখ্যা / ১ ডিসেম্বর, ২০২৩ / ১৪ অগ্রহায়ণ, ১৪৩০

উত্তরকাশীর সুড়ঙ্গ দুর্ঘটনা এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের শুরু মাত্র

তপন মিশ্র


উত্তরকাশীর সিল্কিয়ারা সুড়ঙ্গে ১২ নভেম্বর থেকে আটক ৪১জন শ্রমিককে গত ২৮ নভেম্বর উদ্ধার করা গেছে। সরকার এমনভাব দেখিয়েছিল, বিষয়টাকে যেন ‘এমনটাতো হয়েই থাকে’। তবে এই ঘটনা ট্রেলার মাত্র। আসল চিত্র আরও ভয়ঙ্কর হবে। সুড়ঙ্গ দুর্ঘটনা সম্পর্কে যা ঘটনা ঘটেছে বা ঘটছে তা আমদের জানা। কিন্তু এই ঘটনার পেছনে যে সরকারি চরম গাফিলতি এবং প্রকৃতির নিয়ম এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে অবজ্ঞা করার চেষ্টা রয়েছে তা বলাইবাহুল্য। উদ্ধারকাজ আরও ভালভাবে করা যেতে পারত বা উদ্ধারকাজে আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল সে কথা আমাদের এই সময়কার আলোচনার বিষয় নয়। ঘটনাটি ঘটার পেছনে কারণ রয়েছে অনেক গভীরে।

‘চার ধাম অল ওয়েদার রোড’ প্রকল্পের অংশ হলো উত্তরকাশীর এই সুড়ঙ্গ পথ। চারধাম হাইওয়ে প্রকল্পের লক্ষ্য হলো উত্তরাখণ্ডের চারটি শহর - যমুনেত্রী, গঙ্গোত্রী, কেদারনাথ এবং বদ্রীনাথ-কে সংযোগ করা যাতে হিন্দুত্ববাদীদের আরও একটু উজ্জীবিত করা যায়। এরই অংশ সিল্কিয়ারা টানেল। টানেলটি মোদি সরকারের মর্যাদাপূর্ণ চার ধাম পরিকল্পনার অংশবিশেষ যার লক্ষ্য উত্তরাখণ্ডে হিমালয়ের উপরে ৮৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১২ মিটার প্রস্ত রাস্তা তৈরি। আরও বেশি হিন্দু ভক্তদের উত্তরাখণ্ডের শিবলিঙ্গ মন্দিরগুলি দেখার ব্যবস্থা করা গেলে হিন্দু ভোট বিজেপি’র পক্ষে আসবে। ধর্মীয় আবেগের মধ্যদিয়ে হিমালয়ের স্থিতিশীলতা কতটা বিপদের মুখে পড়তে পারে সে কথা কোনভাবেই সরকার মাথায় আনেনি। একটু ভুল বলা হলো – মাথায় আসলেও আসন্ন বিপদের কথা কোনভাবেই বিবেচনার মধ্যে রাখা হয়নি।

একথা ঠিকই যে, এই রাস্তা তৈরির ফলে কিছু মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি হওয়া সম্ভব। কিন্তু যদি বিজ্ঞানকে উপেক্ষা করে কেবল মুনাফার হিসাব করা হয় তাহলে এই ধরনের পরিকল্পনাগুলি যে পরিবেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আসলে এ হলো জোরকদমে এক স্বৈরাচারীর আত্মপ্রচার। এভাবেই তৈরি হয় ফ্যাসিস্ত শাসক। রাস্তাজুড়ে লেখা ‘প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্প’।

বহন ক্ষমতা লঙ্ঘিত

প্রত্যেকটি বাস্তুতন্ত্রের নির্দিষ্ট বহন ক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ সেই বাস্তুতন্ত্রের প্রাকৃতিক সম্পদ কতটা মানুষের চাহিদা মেটাতে পারবে তার একটি সীমা রয়েছে। যদিও এই ক্ষমতা পরিমাপের জন্য এখনও পাকাপোক্ত কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি। অবশ্য কিছু গবেষণা যে হয়নি তা নয়। হিমালয়ে নিশ্চিতভাবে সেই সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে। এই আশঙ্কায় এবছর মাত্র কয়েকদিন আগে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে হিমালয় পর্বত রয়েছে দেশের এমন ১৩ টি রাজ্যে হিমালয়ের ‘বহন ক্ষমতা’ মূল্যায়ন করার নির্দেশ দিয়েছে এবং এই বহন ক্ষমতা মূল্যায়নের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠনের প্রস্তাব করেছে। ভঙ্গুর হিমালয় ইকোসিস্টেমের টেকসই উন্নয়ন এবং সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ অপরিহার্য।

২০১৯-এর আগস্ট মাসে সুপ্রিম কোর্টের গঠিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি এই রাস্তাকে ১২ মিটার প্রশস্ত করার বিরুদ্ধে সরকারকে সতর্ক করে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছিল - প্রশস্তকরণ ৫.৫ থেকে ৭ মিটারের মধ্যে রাখতে হবে। কিন্তু কিছু সরকার-পোষিত তথাকথিত বিশেষজ্ঞ এই সুপারিশকে বিরোধিতা করে এবং শেষমেষ জোরকদমে রাস্তা তৈরি হতে থাকে।

অতি চালাকের গলায় দড়ি

ইআইএ বা এনভাইরনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট করার যে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা আমাদের দেশে রয়েছে অত্যন্ত কৌশলী পদ্ধতির মধ্য দিয়ে তাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। চার ধাম রাস্তা তৈরির পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হওয়া উচিত ছিল পরিবেশের উপর এর যে প্রভাব পড়বে তা অধ্যয়ন করা। বিশেষকরে হিমালয়ের মতো একটি নবীন, ক্ষণভঙ্গুর এবং এখনও নির্মীয়মান পর্বতের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি ছিল। এখানেই এক কৌশল অবলম্বন করে অত্যন্ত পরিবেশ-বিরোধী মোদী সরকার। পরিবেশের প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ)-কে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রকল্পটিকে বেশ কয়েকটি খণ্ডে বিভক্ত করার পরে যেগুলি ইআইএ-র আওতায় পড়ে না সেগুলিকে পরিবেশগত ছাড়পত্রের নিশ্চয়তা আদায় করার ব্যবস্থা করা হয়। রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে আমাদের দেশে যে আইন আছে তা হলো - রাস্তা বা যে কোনো সরলরৈখিক প্রকল্প (linear project) যদি ছোটো হয় তাহলে তার পরিবেশগত প্রভাব অনুসন্ধান করার দরকার নেই। এই আইন যে ত্রুটি মুক্ত তাও নয়। কারণ সমতলে রাস্তা তৈরি এবং হিমালয়ের উপর রাস্তা তৈরি এক বিষয় নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে, যদি এই প্রকল্পের জন্য একটি সামগ্রিক ইআইএ পরিচালিত হতো, তবে সেখানে একটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (disaster management plan) থাকত এবং এটি এই ধরনের একটি টানেল নির্মাণের জন্য অবস্থানটি নিরাপদ কীনা - তা নির্ধারণ করতে সহায়তা করত। সরকার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সেপথে হাঁটেনি।

দুর্জনের ছলের অভাব হয় না

গত বছর ১৪ ডিসেম্বর, সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে উত্তরাখণ্ডে তার চরধাম প্রকল্পের অংশ হিসাবে ১০ মিটার প্রস্থের সাথে সর্ব-আবহাওয়া রাস্তা নির্মাণের অনুমতি দেয়। সরকার কোর্টে বলে যে, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ থাকায় এই প্রকল্পের অধীনে রাস্তা তৈরির কাজ করতে হবে। সশস্ত্র বাহিনীর পরিকাঠামোগত ইন্দো-চীন সীমান্ত এলাকায় কৌশলগত প্রয়োজনে এই রাস্তার দরকার। ফলে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে আর একটি কৌশলও অতি-সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে অরণ্য (সংরক্ষণ) আইন- ১৯৮০ সংশোধনী সংসদে পাস করা হয়। এই আইন আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। এই আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সীমানা বা নিয়ন্ত্রণরেখা থেকে ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত অরণ্যভূমিকে সংরক্ষণের আওতার বাইরে রাখা হবে। এখানেও দেশের নিরাপত্তার জিগির তোলা হয়।

রাস্তা তৈরির জন্য পাহাড় কাটার ফলে হিমালয়ের অস্থিতিশীলতার উপর প্রভাব সম্পর্কে বেশ কিছু পরিবেশবিদ এবং ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পুরো চারধাম প্রকল্পটি তাড়াহুড়ো করে শেষ করার জন্য সরকার বেশি আগ্রহী। এখানে সরকার বিভিন্ন ধরনের শর্টকাট পদ্ধতি নিয়েছে যা বর্তমান দেশের আইনের পরিপন্থী।

সাম্প্রতিককালে হিমালয়ে বেশ কিছু বিপর্যয় ঘটেছে। এই বিপর্যয়গুলির মধ্যে রয়েছে ২০২১ সালে চামোলি হড়পা বন্যা, ২০২৩ সালের জোশিমঠের ভূমি ধস এবং পশ্চিম হিমালয়ের অন্যান্য অনেক অংশ জুড়ে ভূমিধসের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা। এতো বিপর্যয় ঘটার পরও, এই প্রকল্পে পাহাড় কাটার জন্য যে বিশাল বুলডোজারগুলি কাজ করছে, সেই বুলডোজারের চালকরাই ঠিক করছে কীভাবে পাহাড় কাটা হবে বা কাতোটা অ্যাঙ্গেলে পাহাড় কাটা হবে। এদের বিজ্ঞান নির্ভর পরামর্শ দেওয়ার কেউ নেই।

একথা বহুচর্চিত যে, হিমালয় ভূকম্পনগত এবং টেকটোনিকভাবে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্বতশ্রেণি এবং তাই ভঙ্গুর। এই সংবেদনশীল পর্বতশ্রেণি বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র ধারণ করে। সমগ্র হিমালয় পৃথিবীর ৩৬টির মধ্যে এবং ভারতের ৪টির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের হটস্পট। এর বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র, ঘন বনাঞ্চল থেকে আলপাইন তৃণভূমিতে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ এবং প্রাণী প্রজাতির আশ্রয়স্থল। এখানে এন্ডেমিক প্রজাতির সংখ্যাও অনেক। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জলের ট্যাঙ্ক হলো হিমালয়। হিমালয়ের হিমবাহ এবং তুষারক্ষেত্রগুলি গঙ্গা, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র এবং ইয়াংজির মতো নদীগুলির জলের উৎস হিসাবে কাজ করে, যা দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ধারণ করে। কেবল শ্রমিকদের উদ্ধার করে সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না। তারপরে জবাবদিহি করতে হবে সরকারকে।

এহেন এক প্রাকৃতিক পুঁজিকে নির্বিচারে নষ্ট করছে মোদি সরকার। তাই তার প্রত্যাঘাত সহ্য করতে হচ্ছে সাধারণ দরিদ্র শ্রমিকদের। এভাবে চলতে থাকলে আরও বিপদের দিন আসছে আমাদের জন্য। তাই এখন উন্নয়নের নামে সরকারের এই পরিবেশ বিদ্বেষী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।